আসসালামু আলাইকুম। অনেকেই আমাদের কাছে এমিরিলিস ফুলের বালব এর ফোরসিং সম্পর্ক এ জানতে চান। বিভিন্ন বাগানী তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে বিভিন্নভাবে তাদের এমিরিলিস বালব ফোরসিং করে। আজ আমি আমার সুদীর্ঘ ৬ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে এমিরিলিস বালব এর ফোরসিং নিয়ে আলোচনা করব।
বাইরের শীতপ্রধান দেশগুলোতে সাধারণত এমিরিলিস, টিউলিপ, লিলিয়াম, হায়াসিন্থ, ড্যাফোডিল ইত্যাদি ফুলের বালবগুলো ন্যাচারালি ভারনালাইজেশন হয় বিধায় ওইসব ফুলের বালবগুলোকে সেদেশে কোন প্রকার এক্সট্রা ফোরসিং করা লাগেনা, প্রতি বছরই একটি নির্দিষ্ট সময়ে ফুল দিয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের মত দেশগুলোতে এই জাতীয় ফুলের বালবগুলো ন্যাচারালি ভারনালাইজেশন হতে পারেনা বিধায় প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট সময়ে ফুল আর ফোটেনা বালব থেকে, এমনকি অনেক সময় গাছে পাতা থাকলেও। তখন এদেরকে ফোরসিং করা লাগে। তবে এমিরিলিস ছাড়া উপরে উল্লেখিত বাকি বালবগুলো লাগানোর পর প্রথম বছর ফুল দিলেও পরের বছর গাছ ঠিকমত হয়না, কোনভাবে গাছ পাতা হলেও ফুল হয়না কারন এদেরকে আমাদের দেশের আবহাওয়ায় ফোরসিং করা যায়না।
আজ আমাদের দেশের আবহাওয়ায় এমিরিলিস বালব ফোরসিং এর দুটো পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করবো। এই আলোচনা একান্তই আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে।
প্রথমত আমি যে পদ্ধতিতে সাধারণত এমিরিলিস বালব ফোরসিং করি সেই পদ্ধতি আলোচনা করবো। বিভিন্ন জাতের এমিরিলিস ফুলের ফোটার সময় ভিন্ন। তবে সাধারণত বেশীরভাগ জাতের ফুলই ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল এই সময়ের মধ্যে ফুটে থাকে। এই পদ্ধতিতে আপনাকে কিছু ক্যালকুলেশন করে নিতে হবে সঠিকভাবে। যেমন ফুল/কলি আসার প্রায় তিন মাস আগে থেকে গাছে সব ধরনের সার দেয়া বন্ধ করে দিতে হবে। এরপর ফুল/কলি আসার দুই মাস বাকি থাকতে পানি দেয়া কমিয়ে দিতে হবে। যেমন ধরা যাক আপনি সপ্তাহে ৬-৭ দিন গাছে পানি দেন। সেক্ষেত্রে তা কমিয়ে সপ্তাহে ৩ দিনে আনতে হবে। পানির পরিমাণ কিন্তু আগের মতই দেবেন, সময় কমিয়ে দেয়ায় পানির ডোজ আবার বাড়িয়ে দেবেন না। এই নিয়মে প্রথম ২১ দিন চলবে। পরের সময় থেকে কলি আসার দিন পর্যন্ত পানি দেয়ার সময় আরো কমিয়ে সপ্তাহে ২ দিনে নিয়ে আসতে হবে। তবে একটি বিষয় অবশ্যই এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যেন এমিরিলিস গাছটি প্রতিদিন এভারেজে ৪ ঘন্টার মত সরাসরি রোদ পায়। এভাবে কলি আসার আগ পর্যন্ত চলবে। এমতাবস্থায় গাছের পাতা শুকিয়ে যেতে পারে তবে তাতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই ইনশা আল্লাহ্। সময়মত ইনশা আল্লাহ্ কলি চলে আসবে। তবে কলির মুখ বালব থেকে উঁকি দেয়ার সাথে সাথেই সেই পূর্বের নিয়মে পানি দেয়া শুরু করে দিতে হবে মানে সপ্তাহে ৬-৭ দিন। কলি আসার শুরু থেকে ফুল ফোটা পর্যন্ত সময়ে মাটি ১০০% শুকানো যাবেনা, সবসময় মাটি/মিডিয়া হাল্কা ভেজা রাখতে হবে। কারন মাটি বেশি শুকিয়ে গেলে কলি শুকিয়ে/ঝরে যেতে পারে।
দ্বিতীয় পদ্ধতি হলো ফুল/কলি আসার ৪৫-৫০ দিন আগে মাটি থেকে বালব পুরো তুলে ফেলতে হবে। বালব তুলে শুধুমাত্র পাতা বালবের গোড়া থেকে ২-৩ ইঞ্চি পরিমাণ রেখে বাকি অংশ ছেঁটে দিতে হবে। ছায়াময় ঠান্ডা স্থানে (কোন প্রকার ফ্রিজিং এ নয়) বালব রেখে দিতে হবে। তবে যেখানেই রাখা হোক না কেন সংরক্ষণের জায়গাটি যেন আংশিক/পুরোপুরি অন্ধকারাচ্ছন্ন হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ৪৫-৫০ দিন এভাবে রাখার পর বালব এর শেকড়, পাতার কর্তিত বাকি অংশ শুকিয়ে আসবে। তাতে উদ্বিগ্ন হওয়ার তেমন কিছুই নেই ইনশা আল্লাহ্। এই সময় পরে মাটি ৮৫% এবং ভারমি কম্পোষ্ট ১৫% হারে ভালভাবে মিশিয়ে মেশানো মাটিতে বালব এমনভাবে মাটিতে দিতে হবে যেন বাল্বের ২/৩ ভাগ মাটির নিচে থাকে। আশা করা যায় নির্দিষ্ট সময়ে বালবে কলি চলে আসবে। অনেক সময় মাটিতে লাগানোর আগেও কলি চলে আসতে পারে। সেক্ষেত্রে কলির মুখ উঁকি দিলেই সাথে সাথে মাটিতে লাগানোর ব্যবস্থা করতে হবে এবং নিয়মিত পানি দিতে হবে। এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এভাবে বালব তুলে রাখলে বালব এর সংকোচন হয় এবং বালব এর স্বাভাবিক গ্রোথ এবং ভবিষ্যৎ ছানা (বেবি বাল্ব) প্রডাকশন ব্যাহত হয়।
উপরোক্ত দুই নিয়মের যেই নিয়মেই আপনি ফোরসিং করুন না কেন সবসময় যেই জিনিসটি অবশ্যই মানতে হবে সেটি হচ্ছে ফুল ফুটে স্টিক ঝরে যাওয়ার পর গাছে খাবার দিতে হবে। খাবার হিসেবে শুধুমাত্র কেঁচো সারই সবচেয়ে ভাল এবং যথেষ্ট। তারপরেও চাইলে মাটির সাথে খুব অল্প পরিমাণ (২%) হাড়ের গুড়ো ব্যবহার করতে পারেন।
ফোরসিং না করেও অনেক বাগানিই তাদের এমিরিলিস বালবে ফুল পেয়ে থাকেন তবে সেক্ষেত্রে এমিরিলিসের জাত একটি ফ্যাক্টর। বেশীরভাগ নতুন হাইব্রীড জাতগুলোর বালবে এই ফোরসিং ছাড়া সচরাচর ফুল আসেনা প্রতিবছর।
উপরোক্ত আলোচনা শুধুমাত্র আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকেই শেয়ার করা। আমি প্রায় ১৫-২০ জাতের এমিরিলিস বালবে এই পরীক্ষাগুলো চালিয়েছিলাম। তারপরেও অনেকে ভিন্নভাবেও বালব ফোরসিং করে বা ভিন্ন কোন পদ্ধতি অবলম্বন করে প্রতি বছর তাদের এমিরিলিস বালবে ফুল পেতেই পারেন যা তাদের একান্তই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যদিনা তারা তা শেয়ার করেন। আপনাদের এরকম কোন ভিন্ন পদ্ধতি জানা থাকলে আমাদের লিলি গ্রুপে [https://www.facebook.com/groups/bulbplantsbd] তা শেয়ার করে অন্যদের শেখার সুযোগ করে দেয়ার অনুরোধ রইল।
ধন্যবাদ সবাইকে আমার এই পোষ্টটি মনোযোগ দিয়ে পড়ার জন্য। এই পোষ্টের তথ্যগুলো দিয়ে কেউ উপকৃত হলে পোষ্টের লিংক নিজেদের ফেসবুক টাইমলাইনে/পেইজে/মেসেঞ্জারে শেয়ারের মাধ্যমে অন্যদের জানার সুযোগ করে দেয়ার অনুরোধ রইল।
©রাকিবুল হাসান








